কারেন্ট পোকা বা বাদামি গাছ ফড়িং

বর্তমানে ধান ক্ষেতের সবচেয়ে আলোচিত ও মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা হচ্ছে “কারেন্ট পোকা” বা “বাদামি গাছ ফড়িং”। অনেক কৃষক এ পোকাটির বিষয়ে পরিচিত নন, তাই তাঁরা উদাসীনতার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

পরিচিতি

বাদামি গাছ ফড়িং

বাদামি গাছ ফড়িং (Brown Plant Hopper or BPH) ধানের একটি মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা। যে সমস্ত ধানের জাতে বাদামী গাছ ফড়িং প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই সে সব জাতের ধানে এরা খুব তাড়াতাড়ি বংশ বৃদ্ধি করে। বাদামী গাছ ফড়িং ধান গাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। ফলে গাছ পুড়ে যাওয়ার মতো রং ধারণ করে মরে যায়। আক্রান্ত ক্ষেতে বাজ পড়ে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখতে হপার বার্ণ এর সৃষ্টি হয়। তাই তখন একে হপার বার্ণ বা ফড়িং পোড়া বলে। অধিকাংশ কৃষকের কাছে বাদামী গাছ ফড়িং “কারেন্ট পোকা” বা “গুণগুণী” পোকা নামে পরিচিত। একে BPH বা Brown Plant Hopper বলা হয়ে থাকে। এটি খুবই ছোট আকৃতির পোকা। প্রায় ৪ মিলি মিটার লম্বা। এরা বাদামি রং-এর হয়। তবে বাচ্চা অবস্থায় প্রথমত সাদা হয়ে থাকে। এরা মূলত ধান গাছের গোড়ায় বা খোলে দলবদ্ধভাবে অবস্থান করে। এরা বাচ্চা থেকে পূর্ণবয়স্ক হতে ৫ বার খোলস পরিবর্তন করে, তাই গাছের গোড়ায় মৃত খোলসও দেখা যায়। বাতাস চলাচল করে না এমন ছায়াযুক্ত জায়গায় থাকতে এরা পছন্দ করে। যে স্থানে ধান গাছ হেলে পড়ে সেখানেও এদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।

বংশ বিস্তার

কারেন্ট পোকা

বাদামী গাছ ফড়িং খুবই ছোট আকারের পোকা, প্রায় ৪ লম্বা ও বাদামী রং-এর হয়। এই পোকা পূর্ণ পাখা ও ছোট পাখা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। পূর্ণ ব খোল, পাতা ও পাতার মধ্য শিরার ভিতরে ডিম পাড়ে। ডিমগুলোর ওপর পাতলা চওড়া একটা আবরণ থাকে। ৭-৯ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা (নিম্ফ) বের হয়। বাচ্চাগুলো ৫ বার  খোলস বদলায়। বাচ্চাগুলো প্রথম পর্যায়ে সাদা রঙের হয় ও পরে বাদামী রং ধারণ করে। বাচ্চা থেকে পূর্ণ বয়স্ক ফড়িং এ পরিণত হতে আবহাওয়া ভেদে ১৪-১৬ দিন সময় লাগে ।

ধানে শীষ আসার সময় ছোট পাখা বিশিষ্ট ফড়িং এর সংখ্যাই বেশী থাকে এবং স্ত্রী পোকাগুলো সাধারণত গাছের গোড়ার দিকে বেশি থাকে। গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে লম্বা পাখা বিশিষ্ট ফড়িং এর সংখ্যাও বাড়তে থাকে, যারা এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় উড়ে যেতে পারে। এক জোড়া পোকা ৩-৪ প্রজন্মে প্রায় ৩৫ লক্ষ পোকার জন্ম দেয় এবং ৫০ মাইল পথ অতিক্রম করতে পারে। এই পোকা শরীরের ওজনের তুলনায় ১০-১২ গুন বেশী খাদ্য গ্রহন করে। বীজ তলা থেকে শুরু করে পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত যে কোন সময় এ পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। তবে কাইচথোর বের হওয়ার শুরু থেকে আক্রমণ বেড়ে যায়।

আক্রমনের সময়
সব মৌসুমে এই পোকা কম বেশি দেখা যায় তবে রোপা আমন মৌসুমে আক্রমণ বেশি হয়। বোরো ধান ক্ষেতে এপ্রিল-মে এবং আমন ক্ষেতে সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মাসে বাদামী গাছ ফড়িং এর আক্রমণ বেশি হয়।

আক্রমণের অনুকুল পরিবেশ

হপার বার্ণ

অধিক কুশি উৎপাদনকারী জাতের ধান চাষ
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া (গুমট অবস্থা)
ছায়াযুক্ত স্থানে বাদামী গাছ ফড়িং দ্রুত বংশবৃদ্ধি পায়
জমি স্যাঁতস্যাঁতে হলে ও জমিতে দাঁড়ানো পানি থাকলে
চারা ঘন করে রোপন করলে
অধিক মাত্রায় ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে
বাতাস চলাচল কম হলে এবং
দিন ও রাতের তাপমাত্রা ১৮-২৫ ডিগ্রী সেঃ ও আর্দ্রতা ৮০% হলে

আক্রমণের লক্ষণ
বাদামি গাছ ফড়িং ধানের জমিতে যে কোন সময় আক্রমন করতে পারে, তবে কাইচথোড় বের হওয়ার সময় থেকেই এদের আক্রমন বেশি লক্ষ্য করা যায়। বাদামী গাছ ফড়িং-এর বাচ্চা (নিম্ফ) ও পূর্ণাঙ্গ পোকা উভয়ই ধান গাছের গোড়ায় দলবদ্ধভাবে আক্রমন করে। দৈনিক তাদের শরীরের ওজনের চাইতে ১০ থেকে ২০ গুন বেশি পর্যন্ত রস শোষন করতে পারে। এতে গাছ দুর্বল ও হলুদ হয়ে যায় এবং পরে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। বাদামী গাছ ফড়িং গ্রাসি স্টান্ট, ব্যাগেট স্টান্ট ও উইল্টেড স্টান্ট নামক ভাইরাস রোগ এরা খুব তাড়াতাড়ি বংশবৃদ্ধি করায় এদের সংখ্যা এতো বেড়ে যায় যে আক্রান্ত ক্ষেতে বাজ পড়ার মতো হপারবার্ণ এর সৃষ্টি হয়। এদের আক্রমণে মাঠের পর মাঠ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। বাদামী গাছ ফড়িং- এর আক্রমণে ২০% থেকে ১০০% পর্যন্ত ফসল নষ্ট হয়ে

দমন ব্যবস্থাপনা
প্রতিরোধী আগাম জাতের ধান রোপন করে এর ক্ষান্ত কে ক অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়াও যা যা করতে হবে-
জমির আইল পরিষ্কার রাখতে হবে। সঠিক দূরত্বে চারা রোপন করতে হবে (ঘন রোপন করা যাবে না)
আক্রান্ত জমির পানি সরিয়ে ৭-৮ দিন মাটি শুকনো রাখতে হবে
সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে (ইউরিয়া সার মোটেও বেশি প্রয়োগ করা যাবে না)
আক্রান্ত জমিতে ২-৩ হাত দূরে দূরে “বিলি” কেটে সূর্যের আলো ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে
আক্রমনের মাত্রা বেশি হলে দ্রুত বালাইনাশক স্প্রে করতে হবে।
বালাই সহনশীল জাত (ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ৩১, ব্রি ধান ৩৩, ব্রি ধান ৩৫, বিনা ধান ৭) চাষ করতে হবে এবং
সাধারণত পাইমেট্রোজিন গ্রুপের বালাইনাশক ব্যবহার করে এদের ভালোমতো দমন সম্ভব হয়

তবে “পাইমেট্রোজিন+নিটেনপাইরাম” গ্রুপ সমৃদ্ধ কীটনাশকগুলো এদের দমনে আরো চমৎকার কাজ করে। যেমন- ইনতেফা কোম্পানীর সাবা কারেন্ট পোকা দমনে খুবই কার্যকরী কীটনাশক। ক্ষতিকারক কারেন্ট পোকা সাবা ব্যবহৃত গাছের রস একবার শোষণ করলে ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয় ফলে পোকাটি খাবার গ্রহন বন্ধ করে দেয় এবং পরবর্তীতে স্নায়ুতন্ত্রের বিষক্রিয়ায় মারা যায় । এছাড়াও আক্রমণ কম হলে ইনতেফা কোম্পানীর “ইমিডাক্লোরপ্রিড” গ্রুপের জাদীদ, থায়ামেথোক্সাম ও ল্যামডা সাইহ্যালোথ্রিন গ্রুপের তাকাত জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার করে কারেন্ট পোকা দমন করা যায়। কীটনাশক যাতে গাছের গোড়ায় পৌঁছাতে না পারে তার জন্য স্প্রে করার আগে ধান ক্ষেতে ৩-৪ হাত পর পর “বিলিকেটে” ফাঁকা করে দিতে হবে।