ফসলের রোগের গুরুত্ব, কারণ ও লক্ষণ

কৃষি নির্ভর এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের মানোন্নয়নের তথা খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফসল উৎপাদনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হলো ফসলের রোগ বালাই। তাই ফসলের রোগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা বহুমাত্রিক।
উদ্ভিদ রোগের গুরুত্ব ও তাৎপর্যঃ
ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ফসলের রোগ-বালাই। ফসলের রোগ শুধু উৎপাদন হ্রাস করে না, বরং কৃষকের আর্থিক ক্ষতি, দেশের খাদ্যের ঘাটতি ও অর্থনীতিতেও নেতিবাচক ভূমিকা রাখে। প্রধানত ফসলের রোগের যে নেতিবাচক ভূমিকা তা হল-
১. ফসলের রোগ সরাসরি কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে;
২. ফসলের রোগ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ;
৩. ফসলের রোগ কৃষকের আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ;
৪. ফসলের রোগের কারণে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান কমে যায়।
উদ্ভিদ রোগের কারণঃ
উদ্ভিদ রোগ মূলত তিন ধরনের উপাদানের দ্বারা সৃষ্ট হয়ে থাকে:
১. জীবন্ত (Biotic) উপাদান
২. অজীব (Abiotic) উপাদান
৩. মেসোবায়োটিক (Mesobiotic) উপাদান

১. জীবন্ত (Biotic) উপাদানঃ এগুলো হলো জীবিত প্যাথোজেন বা জীবাণু যার মাধ্যমে রোগ সংক্রমিত হতে পারে। এদের মধ্যে প্রধানত ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, নেমাটোড, শৈবাল ও মাইকোপ্লাজমা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। জীবন্ত উপাদান দ্বারা সৃষ্ট রোগসমূহ সংক্রামক এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।
২. অজীব (Abiotic) উপাদানঃ জলবায়ুগত কারণ, যেমন- অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা, খরা বা অতিবৃষ্টি, দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তন, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ইত্যাদি এবং মাটির গুণমানজনিত কারণ যেমন- মাটির পিএইচ ভারসাম্যহীনতা, মাটিস্থ বায়ু, মাটির আর্দ্রতা, মাটির নমনীয়তা বা শক্ত মাটি, মাটির গঠন, মাটির উপাদান ইত্যাদি কারণ দ্বারা হতে পারে। অজীব উপাদান দ্বারা সৃষ্ট রোগসমুহ মূলত সংক্রামক নয়।
৩. মেসোবায়োটিক (Mesobiotic) উপাদানঃ ভাইরাসজনিত উপাদান-ই মূলত মেসোবায়োটিক। মেসোবায়োটিক উপাদান সমূহ যেমন- ভাইরাস, ভাইরয়েড, প্রিওন এবং ভাইরুসইড রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। ভাইরাস এককভাবে সক্রিয় নয়, তাই এটি পোকা, বীজ বা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বাহিত হয়ে গাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মেসোবায়োটিক উপাদান দ্বারা সৃষ্ট রোগসমূহ মূলত সংক্রামক রোগ।

উদ্ভিদ রোগের লক্ষণঃ
উদ্ভিদ রোগের লক্ষণগুলোকে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়-
১. নেক্রোটিক (Necrotic)
২. হাইপারারিক (Hypertrophic) বা হাইপারপ্লাষ্টিক (Hyperplastic)
৩. এট্রফিক (Atrophic) বা হাইপোপ্লাষ্টিক (Hypoplastic)

১। সেক্রোটিক লক্ষণ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে যেমন-
ক. দাগ(Spot): গাছের আক্রান্ত অংশে নেক্রোসিস এর কারণে বিভিন্ন আকৃতি ও রঙের দাগ হয়। একই রোগের ক্ষেত্রে দাগের আকৃতি ও সাধারণত একই হয়। কখনো কখনো দাগগুলো নিজেদের সাথে মিশে বড় নেক্রোসিস এলাকা তৈরি করতে পারে। যেমন- ধানের বাদামী দাগ রোগ।
খ. ব্লাইট (Blight): গাছের আক্রান্ত অংশের দ্রুত মৃত্যু হওয়াই মূলত ব্লাইট। এক্ষেত্রে আক্রান্ত অংশকে পুড়ে যাওয়ার মত মনে হয়। যেমন- আলুর লেট ব্লাইট রোগ।
গ. গামোসিস (Gummosis): এ ক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত স্থান থেকে আঠা নির্গত হয় এবং চারপাশে শক্ত হয়ে যায়। যেমন, লেবু গাছের আঠা ঝরা রোগ।
ঘ.ক্যাঙ্কার (Canker): এ রোগে গাছের আক্রান্ত স্থানের চারপাশে ক্যালাস জাতীয় বিশেষ কলার সৃষ্টি হয় এবং কিছুটা উঁচু হয়ে থাকে। যেমন-লেবুর ক্যাঙ্কার রোগ
ঙ. গুড়ি পঁচা (Foot rot): এ ক্ষেত্রে গাছের গোড়া পঁচে বাদামী-কালচে দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। যেমন- শিমের গোড়া পঁচা রোগ।
চ. ব্লচ (Blotch): এ রোগে গাছের আক্রান্ত স্থানে পানি ভেজা, তামাটে, বাদামি বা হালকা বেগুনি রঙের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে দাগগুলো ধীরে ধীরে বড় হয় এবং পাতা কুঁকড়ে যায় বা মরে যায়। যেমন-পেঁয়াজের পার্পল ব্লচ রোগ।
ছ. আগা মরা বা ডাইব্যাক (Die back): এক্ষেত্রে গাছের শাখা প্রশাখা আগা থেকে আরম্ভ করে নিচের দিকে ন্যাক্রোসিস হয় ও শুকিয়ে আসে এবং মারা যায়। যেমন সাইট্রাস ফলের ডাইব্যাক বা আগা মরা রোগ।
জ. নেতিয়ে পড়া (Damping off): এ রোগে চারার মাটি সংলগ্ন স্থানে রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং চারা মাটিতে নেতিয়ে পড়ে মারা যায় (Post emergence damping off)। কোন কোন ক্ষেত্রে বীজ অঙ্কুরোদগমের পরেই রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চারা মাটির উপরে আসার আগেই মারা যায় (Pre-emergence damping off) ।
ঝ. পচন (Rot): এক্ষেত্রে গাছের আক্রান্ত অংশ পঁচে যায় এবং আক্রান্ত পঁচা অংশ ভেজা অথবা শুকনো অবস্থাতেই থাকতে পারে। যেমন আলুর নরম পঁচা বা শুকনো পঁচা রোগ।
ঞ. ঢলে পড়া (Wilting): এক্ষেত্রে রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত গাছ ক্রমশ নেতিয়ে পরে বা ঢলে পরে এবং মারা যায়। যেমন- আলুর ঢলে পড়া রোগ।
২.হাইপারট্রফিক (Hypertrophic) হাইপারপ্লাষ্টিক বা (Hyperplastic) লক্ষণঃ গাছের হাইপারট্রফিক বা হাইপারপ্লাষ্টিক লক্ষণ বলতে গাছের টিস্যুও অস্বাভাবিক কোষের আকার বৃদ্ধি বা বিভাজনের ফলে অপ্রাকৃতিক বৃদ্ধি বা গঠন হওয়াকে বোঝায়। এ জাতীয় লক্ষণগুলো হল-
ক. গল বা গাঁটি (Gall) : আক্রান্ত গাছের শাখা, কান্ড বা পাতার রোগাক্রান্ত অংশে কোষের খুবই দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে বিভক্তি ঘটে এবং স্ফীত হয়ে অস্বাভাবিক গল বা গাঁটি তৈরি হয়। যেমন, আমের ক্রাউন গল রোগ।
খ. স্ক্যাব (Scab): এ রোগের কারণে গাছের আক্রান্ত অংশের উপরের ত্বক ফেটে খসখসে হয়ে যায়। যেমন, আলুর কমন স্ক্যাব রোগ।
গ. পাতা গুটানো (Leaf Curl) : এ রোগের ফলে পাতার উপরের তলের চেয়ে নিচের তলের বৃদ্ধি বেশি হয় এবং পাতার কিনারা বরাবর উপরের দিকে গুটিয়ে যায়। যেমন- টমেটোর পাতা গুটানো রোগ।
৩। ট্রফিক (Atrophic) বা হাইপোপ্লাষ্টিক (Hypoplastic) এ জাতীয় লক্ষণগুলো হলো-
ক.ক্লোরোসিস (Cholorosis) : গাছের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিক সবুজ রং না হওয়াকে ক্লোরোসিস বলে। এ ক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত অংশে সবুজ ক্লোরোফিল তৈরি হয় না ফলে গাছের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিক সবুজ রং হয় না।
খ. মোজাইক (Mosaic) : এ রোগে আক্রান্ত হলে গাছের আক্রান্ত অংশে গাঢ় ও হালকা সবুজ ও হলুদ রঙের পাশাপাশি সহ-অবস্থান ঘটে এবং মোজাইক ডিজাইন দেখা যায়। যেমন- তামাকের মোজাইক রোগ।
গ. বামনত্ব (Dwarfing): এক্ষেত্রে উদ্ভিদ কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে এবং গাছ খর্বাকৃতি হয়ে যায়।
ঘ. এলবিকেশন (Albication): পাতার শিরা-উপশিরার সবুজ রং নষ্ট হয়ে গেলে স্বচ্ছ হয়ে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
ফসলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগের রাসায়নিক সমাধানঃ

ফসলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগ যেমন-ধানের সীথ ব্লাইট রোগ, কলার সিগাটোকা, আম/পেয়ারা/লিচুর অ্যানথ্রাকনোজ বা দাগ রোগ ইত্যাদির ব্যবস্থাপনায় প্রোপিকোনাজল ২৫% (সাদিদ ২৫০ ইসি), আলু বা টমেটোর আগাম ও নাবী ধ্বসা, কলার দাগ, কুমড়া জাতীয় ফসলের পাউডারী মিলডিউ ইত্যাদির জন্য ম্যানকোজেব ৬০% + ডাইমেথোমর্ক ৯% (হাছিন ৬৯ ডব্লিউপি) ও ডাইমেথোমর্ক ৪০% + সাইমক্সানিল ১০% (আফনা ৫০ ডব্লিউপি), এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত পচন ও দাগ রোগের জন্য স্ট্রেপটোমাইসিন সালফেট ৭২% (বাহা ৭২ এসপি) ব্যবহার করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, নিরাপদ ফসল উৎপাদন-এ বিভিন্ন রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ একটি বড় প্রতিবন্ধক। এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা শুধু উদ্ভিদ রোগ সনাক্তকরণে-ই নয়, রোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল অবলম্বনের ক্ষেত্রে ও ঠিক তেমনি সাহায্য করবে।

মোঃ আহসান হাবীব
সহকারী অধ্যাপক
উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দিনাজপুর