বীজ হলো কৃষির সবচেয়ে মৌলিক উপাদান, একটি মাঠের উৎপাদনশীলতা, ফলন ও সার্বিক লাভের মাত্রা নির্ধারণে বীজের ভূমিকা অপরিসীম। একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নের মূল ভিত্তিও বীজের উপরই নির্ভর করে। উন্নত জাতের, উচ্চ ফলনশীল ও রোগ সহনশীল বীজ ব্যবহার করলে ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়,খরচ কমে এবং কৃষকের আয়ও বেড়ে যায়।
স্বাধীনতার পর বেশ কয়েক দশক ধরে এই খাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকলেও আশির দশকের শেষভাগ থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রবেশ শুরু হয় এবং বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী শিল্পে। মোট বীজ উৎপাদনের ৫৩ শতাংশই আসে বেসরকারি পর্যায় থেকে। ফসলভেদে এই চিত্র আরও নাটকীয়। হাইব্রিড ধানের বীজে বেসরকারি খাতের অংশ ৯৭ শতাংশ, ভুট্টায় ৯৯ শতাংশ, সবজিতে ৮৬ শতাংশ এবং আলুতে ৭৪ শতাংশ (বাংলাদেশ সীড অ্যাসোসিয়েশন রিপোর্ট, ২০২৩)।
বেসরকারি খাতের প্রসারের বাস্তব চিত্র (ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি)
১৯৯৭ সালটি বাংলাদেশের বীজ শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এ বছরই সরকার বীজ উৎপাদনে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং মৌলিক ও প্রত্যয়িত বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই আজকের শক্তিশালী বেসরকারি বীজ শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
বর্তমানে বীজ ব্যবসার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ৮,০০০ বীজ ডিলারকে নিবন্ধন প্রদান করা হয়েছে এবং প্রায় ৯০,০০০ চুক্তিবদ্ধ চাষি সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বীজ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন (বিএডিসি বার্ষিক রিপোর্ট, ২০২৫)
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ফসলভিত্তিক বেসরকারি অংশগ্রহণঃ
সবজি বীজের বাজারে বেসরকারি খাতের প্রাধান্য সর্বাধিক। দেশে বছরে সবজি বীজের চাহিদা প্রায় ৩,০৬০ টন, যার মধ্যে সরকারি সংস্থা সরবরাহ করে মাত্র ১১৪ টন, অপরদিকে বেসরকারি কোম্পানী সরবরাহ করে ২,৪৬৫ টন এবং কৃষকেরা নিজেরা উৎপাদন করেন ৪৬১ টন। অর্থাৎ সবজি বীজের বাজারে বেসরকারি খাতের সরবরাহের হার প্রায় ৮১ শতাংশ (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার, সীড সেকশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ভেজিটেবল সীড সিস্টেম অ্যাসেসমেন্টস ইন বাংলাদেশ,২০১৫-২০২০)।
এই ব্যাপক বেসরকারি অংশগ্রহণের ফলশ্রুতি হিসেবে গত এক দশকে সবজি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১ কোটি টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে মোট সবজি উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৫২ লাখ টন, সেখানে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ টন।
উন্নত ও নতুন জাতের বীজের কারণে সবজির ফলন গত দুই দশকে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হচ্ছে। তাই এখন সারা বছর সবজি পাওয়া যাচ্ছে। তরুণেরাও বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি কোম্পানির ভূমিকা:
বাংলাদেশের বেসরকারি বীজ শিল্পে অসংখ্য কোম্পানী কাজ করলেও বিশেষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শিল্পটির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইনতেফা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি কোম্পানীগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ইনতেফা ভুট্টা বীজ (যুরাহ ২৫৫৫, PAC 731), ধনিয়া বীজ, ঢেঁড়শ বীজ বারোমাসি ADV 101, আগাম ADV 102, ধান বীজ বাযরাহ (আমন মৌসুমের ব্রি ধান ৪৯, ব্রি ধান ৫১, ব্রি ধান ৭৫, ব্রি ধান ৯৩, বিনা ধান ০৭, বিনা ধান ১৭, বোরো মৌসুমের জিরাশাইল (খাটো), ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ২৯, ব্রি ধান ১০৮) কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করছে।
ইনতেফা’র বীজ জলবায়ু সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী, উচ্চ ফলনশীল ও কম উৎপাদন খরচ নিশ্চিত করে যা ডিজিটাল যুগের কৃষিকাজের চাহিদার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ।
গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা:
বাংলাদেশের বীজ খাতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বন্যা ও নতুন রোগ-বালাই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উৎপাদন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়নে (R & D) বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়, ফলে জলবায়ু সহনশীল ও উন্নত জাত উদ্ভাবন ব্যাহত হচ্ছে।”
বর্তমানে সরকারি-বেসকারি সংস্থা মিলে মাত্র ৩০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ করতে পারছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেসরকারি গবেষণা বিনিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কৃষকদের মাঝে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহের লক্ষ্যে ইনতেফা’র নিজস্ব R & D রয়েছে। যেখানে বীজের মাঠ পর্যায়ে গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার ক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এই মডেলের মাধ্যমে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক জ্ঞান ও বেসরকারি কোম্পানীর বাণিজ্যিক দক্ষতা-দুইয়ের সমন্বয়ে উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা যায়। এ ক্ষেত্রে
Bangladesh Resource Center for Indigenous knowledge (BARCIK) -এর মতো বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণের কাজ করে। তবে বৃহৎ পরিসরে গবেষণা জোট গঠনের উদ্যোগ এখনো সীমিত।
আমদানি নির্ভরতা বনাম দেশীয় উৎপাদন:
অধিকাংশ বীজ এখনো আমদানি করা হয়, যার বেশির ভাগই আসে ভারত থেকে। হাইব্রিড ধানের বীজও ব্যাপক পরিমাণে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা হয়। দিন দিন বেসরকারি খাতের বীজ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও আমদানি নির্ভরতার মাত্রা উদ্বেগজনক। বীজ নিরাপত্তাহীনতা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
ভবিষ্যতে করণীয়-
১.বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণের পথ নির্দেশ
২.গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে গবেষণা ও উন্নয়নে। কোম্পানিগুলোকে মার্কার অ্যাসিস্টেড ব্রিডিং, জিনোম এডিটিং ও আণবিক প্রজননের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবনে উৎসাহিত করতে হবে।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) জোরদারকরণ
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বেসরকারি কোম্পানীগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। ‘পিপিপি ইন এগ্রিকালচার’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সহযোগিতার কাঠামো উন্নত করা সম্ভব।
বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সিকে শক্তিশালী করার জন্য বীজ আইন, ২০১৮ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এই সংশোধনের ফলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বীজ কোম্পানীর সংখ্যা বাড়বে এবং বীজ মানের নিশ্চয়তা বাড়বে।
কৃষক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি
বেসরকারি সংস্থাগুলোকে মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। কৃষকদের বীজের গুরুত্ব এবং নকল বা মানহীন বীজের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে গ্রাম পর্যায়ে বীজ মেলা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও প্রদর্শনী প্লটের আয়োজন জরুরি। বেসরকারি কোম্পানীগুলো তাদের পণ্যের কার্যকারিতা ও ব্যবহার পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের সরাসরি অবহিত করতে পারে।
টেকসই বীজ উৎপাদন নিশ্চিতকরণ
বেসরকারি খাতের বীজ সংরক্ষণের উদ্যোগগুলোকে আরও পেশাদার করতে হবে। দেশীয় বীজ জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং বিপদাপন্ন প্রজাতির পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বেসরকারি কোম্পানীগুলোকে যুক্ত করা যেতে পারে। জাতিসংঘের বীজ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বীজ উৎপাদন পদ্ধতি চালু করা দরকার।
বাংলাদেশের বীজ শিল্পের বর্তমান বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। ৫৩ শতাংশ বীজ সরবরাহ, হাইব্রিড ধান ও ভুট্টায় প্রায় ৯৯ শতাংশ অংশীদারিত্ব এবং বিশ্বপর্যায়ে স্বীকৃত উদ্ভাবন সব মিলিয়ে এই খাত আজ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করছে। ইনতেফা মানসম্পন্ন বালাইনাশক সরবরাহের পাশাপাশি উচ্চ ফলনশীল ও মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের মাঝে সরবরাহ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
ভবিষ্যৎ বীজ শিল্প নির্ভর করবে বেসরকারি কোম্পানীগুলোর আদ্যোপান্ত উদ্ভাবনী সক্ষমতার ওপর। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আইনগত সহায়তা-এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি বীজ খাত কেবল দেশ নয়, বিশ্ববাজারেও হয়ে উঠতে পারে এক অনুকরণীয় সাফল্যের গল্প।

মোঃ সাদিকুর রহমান
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
বীজ প্রযুক্তি বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
গাজীপুর